দেশে ধর্ষণের এই ব্যাপকতা কেন?

শেয়ার করুন

সম্পাদকীয়

দেশ দিশাহারা ধর্ষণ বিস্তারে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ সোচ্চার হয়েছেন ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে। সিনেমা নাটকের তারকারা যেমন সচেতন হয়েছেন তেমনি সচেতন হয়েছেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বকারীরাও। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্ষণবিরোধী কত শত স্ট্যাটাস লিখছেন।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ধর্ষণ হচ্ছে। নারীকে বিবস্ত্র করা হচ্ছে। এই দৃশ্য ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এই বর্বরতা সহ্যক্ষমতার বাইরে। কী একটা অসুস্থ প্রজন্ম গড়ে উঠেছে এ দেশে! আমাদের পরিবারগুলোতে এভাবে ধর্ষক গড়ে উঠল আর আমরা কেউ টেরই পেলাম না। ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। সাধারণ জনগণ না পারছে কইতে, না পারছে সইতে। বিচার চেয়ে মানববন্ধন করতে গেলে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা। এভাবে বিচার চাইতে চাইতে ক্লান্ত জনগণ যখন বিচার করার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেবে তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই ধর্ষণের নজিরবিহীন শাস্তি নিশ্চিত হোক— এটাই আজ গণমানুষের দাবি।

ধর্ষণ হচ্ছে একটি সেক্সুয়াল ক্রাইম বা সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স। আদতে ধর্ষণ কোনো যৌনতা নয়, এটা পুরুষের ক্ষমতার অপব্যবহার। আর ক্ষমতার ছায়াতলেই মূলত বেড়ে ওঠে ধর্ষকরা। সাধারণত, মানুষ যেটা দেখে দেখে শিখে সেটা সে নিজে ট্রাই করে দেখতে চায়। সিনেমাতে পরিবারের সবাই মিলে ধর্ষণের দৃশ্য উপভোগ করা সমাজে এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়ার তো কথা ছিল না। যা হওয়ার তাই তো হচ্ছে। উঠতি তরুণ বয়সে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতার স্বাদ পেলে— সে ক্ষমতা কে না খাটাতে চায়? দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা যখন ক্রিমিনাল ফ্রেন্ডলি হয়ে উঠে মূলত তখন অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত উগ্র ক্ষমতার জোরেই এরা ধর্ষণের সাহস করে।

যৌনশক্তি আল্লাহ তাআলার দেয়া এক অমূল্য সম্পদ। এই সেনসিটিভ এনার্জিকে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার না করা হয় তবে এর অপব্যবহার হবে এটাই স্বাভাবিক। তার ওপর যদি থাকে নৈতিক অধঃপতন এবং উগ্র ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ তাহলে তো ধর্ষণ ঠেকানোর আর কোনো রাস্তাই খোলা নেই।

এ দেশে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেরা বেশির ভাগ সময় সেক্সুয়ালি হয়ে থাকে। বিজ্ঞাপনে আর বিলবোর্ডে সর্বদা শোভা পাচ্ছে স্বল্প বসনা নারী ও শলিলজ টিচার ট্রেনিং কলেজের সামনে “গ্রিক দেবী ভেনিস মূর্তি” ভাসক্বার্যে যেখানে  তার দেহের আকর্ষণীয় সব উঁচুনিচু ভাঁজগুলো উপস্থাপন করা হচ্ছে, ক্রিকেট খেলাওফুটবল খেলার মাঝখানে চিয়ার্সগার্লসদের বেলি ড্যান্স, মোবাইল ফোনে সহজলভ্য সেক্সুয়াল কন্টেন্ট, ওয়েব সিরিজ, পর্নোগ্রাফি, এবংমার্কেটে সাজিয়ে রাখ মেয়ে ডল, ও পর্যটন এলাকা সহ পার্ক গুলোতেও বেহায়াপনা, অশ্লীল সিনেমা আরো কত কি। এগুলো তরুণদের মাঝে যৌন উন্মাদনা তৈরি করছে।
নারীদেহকে যারা সেক্স সাবজেক্ট হিসেবে ভোগের সস্তা পণ্য করে উপস্থাপন করে এরা সবাই মূলত ধর্ষক। এই সেক্সসুয়েল অবস্থা দেখে দেখে তরুণরা উত্তেজিত হয়ে থাকে। কিন্তু হালাল পন্থায় এই এনার্জি ব্যয় করার কি তার কোন জায়গা আছে? না, নেই! ফলাফলস্বরূপ চলছে বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক, আর ক্ষমতা থাকলে বীরদর্পে ধর্ষণ। সংবাদমাধ্যম, গণমাধ্যম, ফেসবুকের নিউজফিডে যেন একটাই নিউজ— ধর্ষণ! ধর্ষণ! আর ধর্ষণ!
প্রতিটি জাতীয় দৈনিকে যদি হত্যা ও ধর্ষণের জন্য আলাদা একটি পাতা নির্ধারিত থাকে, ওই পাতা কোনোদিন খালি থাকবে বলে মনে হয় না। প্রতিটি জেলায় প্রায় প্রতিদিন এজাতীয় ঘটনা ঘটছে। তাই, এই মহামারির প্রকোপ থেকে মুক্তি পেতে— বিয়েকে সহজ করুন, অশ্লীলতার সকল পথ বন্ধ করুন, উগ্র ক্ষমতার প্রয়োগ থামিয়ে দিন এবং সন্তানদের নৈতিকতা ও মানবিকতার সবক দিন।
দিনরাত তরুণসমাজকে ! নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, বইপুস্তক এবং ইন্টারনেট সব জায়গায় নগ্নতা ও যৌনতায় ভরপুর থাকবে, বিয়ে কঠিন হবে, ক্ষমতার রাজনৈতিক মহড়া চলতে থাকবে আর কিছু ধর্ষককে ধরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলেই ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে—এ ধারণা নিছক শিশুসুলভ ধারণা বলেই আমার কাছে মনে হয়।
মানুষকে মানুষ বানানো এত সহজ কাজ নয়। যেমন গরুর পেট থেকে বের হলেই সেটা গরু হয়, ছাগলের পেট থেকে বের হলেই সেটা ছাগল হয় কিন্তু মানুষের পেট থেকে বের হলেই সেটা মানুষ হয়ে যায় না বরং সেটাকে মানুষ বানাতে হয়। মানুষকে মানুষ বানানো না গেলে তার মধ্যে পশুসুলভ আচরণ তৈরী করে। তখন তার মধ্যে আর মনুষ্যত্ব থাকে না। এমনকি কখনো কখনো সে পশুকেও ছাড়িয়ে যায়। আর নিবিড় পরিচর্যা, নৈতিক সুশিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা তাকে ধীরে ধীরে আলোকিত মহামানবে পরিণত করে। তাই, মানুষকে মানুষ বানাতে দরকার নৈতিক শিক্ষা ও মানবিকতার চর্চা। পরিবারে, সমাজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রাষ্ট্রীয়ভাবে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিকতার চর্চা করা খুব জরুরি।
যদি আমরা আসলেই সমাজ থেকে ধর্ষণ বন্ধ করতে চাই— তাহলে আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে অপরাধ প্রবণতাবিরোধী এবং মানবতাবান্ধব একটি সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও খোদাভীতি সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে। শুধু তাই নয়, আগে শাসকশ্রেণি ও অভিভাবকদের নিজেদেরকে খোদাভীতিসম্পন্ন মানুষে পরিণত করতে হবে। তবেই কেবল সামগ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।

Related posts

Leave a Comment